বিদেশে পড়াশোনা, চাকরি কিংবা ভ্রমণের স্বপ্ন দেখেন অনেকেই। কিন্তু সেই স্বপ্নের দরজায় এখন কার্যত কড়া তালা। ইউরোপ, আমেরিকা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—হঠাৎ কেন এই ভিসা সংকট, আর এর দায় আসলে কার?
সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা কিংবা ভ্রমণের সুযোগ পেয়েও বহু বাংলাদেশি শেষ পর্যন্ত ভিসা না পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, সব ধরনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিকভাবে জমা দেওয়ার পরও আবেদন বাতিল হচ্ছে, অথচ এর পেছনে কোনো নির্দিষ্ট কারণ জানানো হচ্ছে না। এতে ভিসা প্রত্যাশীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও হতাশা বাড়ছে।
একই ধরনের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার ক্ষেত্রেও। অনেকেই বলছেন, দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও তারা ভিসা পাচ্ছেন না। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে কড়াকড়ি বেড়েছে বলে মনে করছেন আবেদনকারীরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ভিসা বন্ড তালিকায় বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিসা না পাওয়ার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, ভুয়া কাগজপত্রের ব্যবহার। শিক্ষাগত সনদ, কাজের অভিজ্ঞতা কিংবা ব্যাংক স্টেটমেন্ট জাল করে জমা দেওয়ার প্রবণতা বাংলাদেশিদের ঝুঁকিপূর্ণ আবেদনকারী হিসেবে চিহ্নিত করছে। দ্বিতীয়ত, ভিসার শর্ত ভেঙে অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার ঘটনা, যা ব্যক্তির পাশাপাশি পুরো দেশের ভাবমূর্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলো এখন ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সুশাসনকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে ব্যাকগ্রাউন্ড চেক ও বায়োমেট্রিক যাচাই আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর হয়েছে।
শ্রমবাজারেও ভিসা সংকট স্পষ্ট। সৌদি আরব ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশ বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ বা সীমিত করেছে। জাপান ও সিঙ্গাপুরে কিছু দক্ষ কর্মী গেলেও সংখ্যাটি খুবই কম। শিক্ষার্থী ও পর্যটন ভিসার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর গড়ে এক লাখ বাংলাদেশিকে বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত পাঠানো হয়। গত আট বছরে শুধু ইউরোপ থেকেই ফিরেছেন অন্তত চার হাজার বাংলাদেশি।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়—ভিসা জটিলতায় বিদেশ যেতে না পারার দায় কার? ব্যক্তি, দালাল নাকি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার? বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের জন্য এককভাবে কাউকে দায়ী করা যায় না। ভুয়া কাগজপত্র, অবৈধ অবস্থান এবং দুর্বল সুশাসন—সব মিলিয়েই বর্তমানে বাংলাদেশের পাসপোর্ট আন্তর্জাতিকভাবে উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। যতদিন এই বাস্তবতা বদলাবে না, ততদিন বিদেশযাত্রার স্বপ্ন আটকে থাকবে ভিসা জটিলতার বেড়াজালে।

Leave a Reply