কারাফটকে ছাত্রলীগ নেতা মিনিট পাঁচেক দেখলেন স্ত্রী-সন্তানের লাশ

স্ত্রী ও ৯ মাসের শিশু সন্তানের মৃত্যুতে প্যারোলে মুক্তির অনুমতি পাননি বাগেরহাট জেলার সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম। এ কারণে শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে দূর থেকে তাকে শেষবার স্ত্রী সন্তানের মুখ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়।

কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, মরেদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে সাদ্দামের পরিবারের নিকট ছয় সদস্যকে কারা ফটকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। স্ত্রী ও সন্তানকে শেষবারের মতো দেখতে মিনিট পাঁচেক সময় দেওয়া হয় সাদ্দামকে। দীর্ঘ সময় পর স্ত্রীকে শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখেন এবং জীবনে প্রথমবারের মতো নিজের মৃত সন্তানকে কোলে তুলে নেন তিনি। এ সময় উপস্থিত কারারক্ষী ও স্বজনদের মধ্যে এক শোকাতুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হন সাদ্দাম। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন মামলায় যশোর কারাগারে বন্দি রয়েছেন।

গত শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামের একটি বাড়ি থেকে কানিজ সুর্বনা স্বর্ণালী নামে এক নারীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার পাশেই পাশেই নিথর অবস্থায় পড়েছিল স্বর্ণালীর ৯ মাসের শিশু নাজিমের নিথর দেহ।

পুলিশ ও নিহতের পরিবারের দাবি, হতাশাগ্রস্ত হয়ে শিশু সন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন স্বর্ণালী। পুলিশ জানায়, তারা সুবর্ণা স্বর্ণালীকে ঘরের ফ্যানের সঙ্গে রশি দিয়ে ঝুলে থাকা অবস্থায় এবং ছেলেকে মেঝে থেকে উদ্ধার করেছে। সুবর্ণার স্বামী নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের সদর উপজেলা শাখার সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম। মর্মান্তিক এই মৃত্যুর পর কারাগারের জেলরের সাথে যোগাযোগ করেন সাদ্দামের স্বজনেরা। প্যারোলে মুক্তির আবেদনও করেছিলেন তারা। তবে জেলার তাদের আবেদন নাকচ করেন। বাধ্য হয়ে শেষবারের মতো স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ জেল ফটকে আনার ব্যবস্থা করেন সাদ্দামের স্বজনেরা।

শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টার দিকে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সে করে সাদ্দামের স্বজনেরা আসেন। তাদের সঙ্গে দুটি মাইক্রোবাসে ১২ থেকে ১৫ জন স্বজন আসেন। সকল কার্যক্রম শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ছয়জন পরিবারের নিকট সদস্যসহ মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি কারাগারে প্রবেশের অনুমতি দেয় কারাকর্তৃপক্ষ। পাঁচ মিনিট পর তাদের আবারও বাইরে বের করে দেওয়া হয়। মর্মান্তিক এই খবরে গণমাধ্যমকর্মী ছাড়া কারাগারের সামনে বসাবসরত অনেক স্থানীয়দের ভিড় লক্ষ করা গেছে। হৃদয় বেদনায়ক এই দৃশ্য দেখে বাইরে অপেক্ষামান স্বজনদের আহাজারিতেও বাতাস ভারী হয়ে যায়।

সাদ্দামের চাচাতো ভাই সাগর ফারাজী বলেন, ‘সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তান মারা যাওয়ার পর আমরা কারাগারে যোগাযোগ করি। কিন্তু প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি। উনি তো মার্ডার মামলার আসামি না। রাজনৈতিক মামলায় কারাগারে রয়েছেন। মুক্তি না পাওয়ায় আমরা অনেকেই এসেছি কারাগারে। কিন্তু ছয় জনের বেশি প্রবেশ করতে দেয়নি। সাদ্দাম যে ক্লান্তিলগ্নে তার পরিবারটাই নাই। তার এই দুঃসময়ে আমাদের দেখলে ভালো লাগতো। তবে আমাদের ঢুকতে দেয়নি কারাকর্তৃপক্ষ। সাদ্দামের সাথে এই ধরনের ঘটনা নির্দয়, দুঃশাসন। মানবিক দিক থেকেও আজ প্যারোলে মুক্তি দেওয়া উচিত ছিল।

সাদ্দামের শ্যালিকা কারাফটকে আহাজারি করতে করতে সাংবাদিকদের বলছিলেন, ‘এই রাজনীতির এই পরিনাম হলো! সে তো খুনি না। রাজনৈতিক ছোট একটা মামলা। তাও প্রশাসন তাকে ছাড়লো না। সাদ্দাম আমার দুলাভাই না, বড়ভাই ছিল। সে কখনো কান্না করেনি। আজ তাকে কান্না করতে দেখেছি। তাকে কিছুক্ষণ জামিন দিয়ে স্ত্রী সন্তানের জানাজায় অংশ নিতে দেওয়া উচিত ছিল।’

সাদ্দামের স্বজনেরা জানান, প্রশাসন মুক্তি না দেওয়াতে বাগেরহাট থেকে যশোরে এসেছি। সড়কও খারাপ। বাদ এশা জানাজা হওয়ার কথা থাকলেও গভীররাত হয়ে যাবে জানাজা। সাদ্দামের স্ত্রী ও তার সন্তানের জানাজা রাতেই করা হবে।

যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আবিদ আহমেদ বলেন, ‘কারাফটকে মরদেহ নিয়ে আসার পর আমরা ছয়জনকে প্রবেশ করতে দিই। পাঁচ মিনিট সাদ্দাম তার মৃত স্ত্রী ও সন্তানকে শেষবারের মতো দেখতে পেরেছে। সাধারণত অনুমতি না নিলেও কোনো কারাবন্দির স্বজন মারা গেলে, তার মরদেহ যদি কারাফটকে আনে স্বজনেরা, তাহলে আমরা মানবিক দিক বিবেচনা করি দেখতে দেই।’

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *