গণভোটে বিপুল জনসমর্থনের মধ্য দিয়ে ‘জুলাই সনদ’ অনুমোদন পাওয়ায় রাষ্ট্র পরিচালনা ও সাংবিধানিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। নতুন এই রায়ের ফলে দেশের সংবিধানে একগুচ্ছ মৌলিক সংস্কার যুক্ত হতে যাচ্ছে, যা নাগরিক অধিকার, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহি আরও জোরদার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিজয়ের মাধ্যমে ৪৭টি সাংবিধানিক সংশোধনের প্রস্তাব কার্যকর করার পথ খুলে যায়। সংশোধনগুলোর লক্ষ্য—রাষ্ট্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্বচ্ছ এবং জনগণকেন্দ্রিক করা।
নাগরিক পরিচয় ও ভাষায় বড় পরিবর্তন
নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাংলার পাশাপাশি দেশে প্রচলিত সব মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পাবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের জাতীয় পরিচয় “বাঙালি” থেকে পরিবর্তন করে “বাংলাদেশী” করা হবে।
সংবিধান সংশোধন ও জরুরি ক্ষমতায় নতুন নিয়ম
এখন থেকে সংবিধান সংশোধনের জন্য নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হলে গণভোটের প্রয়োজন হবে। জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রেও শুধু প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত যথেষ্ট হবে না—মন্ত্রিসভা ও বিরোধী দলের সম্মতি লাগবে।
রাষ্ট্রের মূলনীতি ও নাগরিক অধিকার
রাষ্ট্রের মূলনীতিতে যুক্ত হচ্ছে—সামাজিক সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার অধিকার সংবিধানে যুক্ত হচ্ছে এবং কোনো সরকার ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করতে পারবে না।
ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন কাঠামো
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে সংসদ সদস্যদের গোপন ব্যালটে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদানের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিবারের সম্মতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পদে এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট—উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব এবং নিম্নকক্ষে নারীদের সংরক্ষিত আসন ধাপে ধাপে ১০০-তে উন্নীত করা হবে। ডেপুটি স্পিকার হবেন বিরোধী দল থেকে এবং সংসদ সদস্যরা দলীয় নির্দেশনার বাইরে ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা পাবেন।
বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান
বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণে বিচারক নিয়োগ, বিভাগভিত্তিক হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন এবং সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পাবলিক সার্ভিস কমিশন, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগে সরকার ও বিরোধী দলের যৌথ কমিটি গঠন করা হবে, যাতে একক কর্তৃত্বের সুযোগ না থাকে।
জনপ্রশাসন সংস্কার ও নতুন বিভাগ
প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কারের জন্য স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। বিদ্যমান পিএসসিকে সাধারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—এই তিন ভাগে বিভক্ত করার চিন্তা করা হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন করে কুমিল্লা ও ফরিদপুর বিভাগ গঠনের প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের এই বিজয় কেবল একটি সাংবিধানিক পরিবর্তন নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। নতুন সরকার এসব সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে—কারণ সংশোধিত সংবিধানেই নাগরিক অধিকার সুরক্ষার দৃঢ় কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।

Leave a Reply